সর্বশেষ

এক প্রবাসীর সফলতার গল্প

অনলাইন ডেস্ক নিউজ | আপডেট: ০১:০৩, সেপ্টেম্বর ১৭ , ২০১৮

অনলাইন ডেক্স: প্রতিবছরই ভাগ্য বদলাতে বিদেশ যাচ্ছেন কয়েক লাখ বাংলাদেশি। বেকারত্ব দূর করে সংসারে সুখ আনতে মাতৃভূমি ছাড়ছেন তারা। কিন্তু, তাদের কতজন কাক্সিক্ষত সফলতা পাচ্ছেন? ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই ভাগ্য বদল হয়েছে, সংসারে সুখ এসেছে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে। আবার বিদেশে গিয়ে সর্বস্ব হারানো মানুষের কান্নাও ভেসে আসে মিডিয়ার কল্যাণে। বিদেশে গিয়ে সফলতার উচ্চশিখরে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। তাদের মধ্যে দাতো মোহাম্মদ এবাদত হোসেন অন্যতম। শুধু সংসারে সুখ নয়, সফল বলতে যা বুঝায় তাই হয়েছেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া উপজেলার পার ঝনঝনিয়া গ্রামের মৃত মোহাম্মদ সোহরাব হোসেনের ছেলে এবাদত। ঢাকার ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ থেকে বিকম পাস করে ১৯৯০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে পাড়ি জমান তিনি। বড় ভাই নেয়ামত হোসেন সেখ ছিলেন মালয়েশিয়া প্রবাসী। যে কারণে বিদেশমুখী মনোভাব ছিল ছোটবেলা থেকেই। প্রায় দুই বছর ওমানে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন এবাদত। ১৯৯৩ সালে ছুটিতে দেশে এসে বিয়ে করার পর আর বিদেশে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। তাই চাকরি নেন ঢাকার আমিন ফ্যাব্রিক্সে। এরপর সেখান থেকে উত্তরা মটরস, উত্তরা ফাইন্যান্সে চাকরি করেন ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ১৯৯৫ সালেই যোগ দেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে ব্যবসা শুরু করেন, সদস্য হন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের। ৯৬ সালে শেয়ারবাজারের অস্থিতিশীলতার সময়েও ভাগ্যবান এবাদতের ব্যবসা হয়েছে জমজমাট। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরাসরি শেয়ার ব্যবসায় জড়িত ছিলেন তিনি। বড় ভাই মালয়েশিয়ায় থাকার সুবাদে ২০০২ থেকেই যুক্ত হন ম্যানপাওয়ার ব্যবসার সাথে। শেয়ারবাজার ও ম্যানপাওয়ার ব্যবসা দুটোই চালিয়ে গেলেন সমানতালে। ২০০৮ সালে হঠাতই মারা যান তার বড় ভাই নেয়ামত হোসেন। বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন এবাদতসহ পুরো পরিবার। কিন্তু স্বপ্ন যার আকাশ ছোঁয়ার তাদের তো বসে থাকার সময় নেই। ভাইয়ের ম্যানপাওয়ার বিজনেস নিজের হাতে তুলে নিলেন। অফিস নিলেন ঢাকায়। এরপর ঢাকা ও মালয়েশিয়ায় ব্যবসার কাজে নিয়মিত যাতায়াত। ধীরে ধীরে ব্যবসা প্রসারিত হতে থাকে এবাদত হোসেনের। মালয়েশিয়ায় ম্যানপাওয়ার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সময়ই ২০০৪ সালে বড় ছেলেকে লেখাপড়ার জন্য স্ত্রীসহ পাঠিয়ে দেন লন্ডনে। ওই সময়ই তারা সেখানকার রেসিডেন্সি পান। বড় ভাই মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী ও সন্তানদের ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করেন। সাথে ছোট ভাই, আত্মীয়-স্বজনকেও ফ্রান্সে সিটিজেনশিপ নিয়ে দেন। পারিবারিক কারণেই ফ্রান্সে যাতায়াত বাড়ে এবাদত হোসেনের। এই ফাঁকে ফ্রান্সেও বিজনেস শুরুর কথা ভাবেন তিনি। যেই ভাবা সেই কাজ। ২০০৯ সালে ফ্রান্সে মানি ট্রান্সফার ব্যবসা শুরু করেন। এরই মধ্যে পরিচয় হয় লন্ডনভিত্তিক জেএমজি কার্গোর কর্ণধার সিলেটের মনির আহমেদের সঙ্গে। ২০১৫ সালে তার প্রতিষ্ঠান জেএমজি কার্গোর শাখা খোলেন ফ্রান্সে। প্রবাসীদের মালামাল পরিবহণে দ্বিতীয় কোনো এয়ার কার্গো নেই ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে। তাই অল্প সময়েই জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল হয়ে ওঠে ফ্যান্স জেএমজি কার্গো সার্ভিস। ফ্রান্সসহ ইউরোপে জেএমজি কার্গো ব্যবসা পরিচালনায় ইবাদাত হোসেন তার স্ত্রী আবিদা সুলতানাকে (সিইও) দায়িত্ব দেন। পেশায় একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন আবিদা সুলতানা। সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ফ্রান্সে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরেন যোগ্যতার সাথে। তার সঙ্গে থাকেন দ্বিতীয় ছেলে ও ছোট মেয়ে। বড় ছেলে থাকেন লন্ডনে। ২০১৫ সালে এবাদত হোসেনের জীবনে আরেকটি সফলতা আসে মালয়েশিয়া থেকে। ব্যবসা ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ২০১৫ সালে সেদেশের রাজকীয় ‘দাতো’ উপাধি দেয়া হয় তাকে। শুধু শেয়ারবাজার, ম্যানপাওয়ার ও কার্গো ব্যবসায়ই নয়, দিনের পর দিন ব্যবসার পরিধি বাড়তেই থাকে। ২০১৩ সালে সরকার ভিওআইপি লাইসেন্স দেয়। এবাদত হোসেনের ভিওআইপি প্রতিষ্ঠানের নাম ভয়েস টেল বিডি। ভিওআইপি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ভিওআইপি সার্ভিস প্রোভাইডার-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কনস্ট্রাকশন ফার্ম- ‘এশিয়াজ কনস্ট্রাকশন এসডিএন-বিএইচডি ও বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালকও তিনি। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দেশটিতে প্রায় ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশির বসবাস। চলতি বছরের জানুয়ারিতে (২০১৮) মালয়েশিয়াতেও জেএমজি কার্গোর অফিস খোলেন। অল্পদিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মালামাল পরিবহণে জেএমজি কার্গো জনপ্রিয় ও ব্র্যান্ড হয়ে পড়েছে বলে জানান ইবাদাত হোসেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসীরা পরিবারের জন্য কোনো কিছু পাঠাতে পারতো না বা বাংলাদেশ থেকে নিতে পারতো না। মায়ের জন্য বা স্ত্রীর জন্য কসমেটিক্স পাঠাবে বা চাহিদার কোনো পণ্য পাঠাবে তা আগে পাঠানো কঠিন ছিল। ব্যক্তির মাধ্যমে হ্যান্ডব্যাগে অল্প পরিসরে পাঠাতে পারতো। কিন্তু, জেএমজি কার্গো সার্ভিসের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ও কম খরচে পছন্দের মালামাল দেশে পাঠাতে পারছে আবার নিতেও পারছে। প্রবাসী ভাইদের জন্য আমি কিছু করতে পারছি এটাই আমার বড় পাওনা। দাতো এবাদত বলেন, অন্যান্য কার্গো সার্ভিসের চেয়ে জেএমজি কার্গোতে খরচ কম। ইউরোপে তো একমাত্র আমরাই কার্গো সার্ভিস দিচ্ছি। বাংলাদেশ বিমানের একমাত্র সেলস এজেন্ট। আর মালয়েশিয়ায় তো কোনো কার্গো সার্ভিস ছিলই না। আমরাই শুরু করেছি। ৩ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে জেএমজি কার্গো সার্ভিস চালুর আশা রেখে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা সৌদি আরব ভিজিট করেছি। সব বিষয়ে আমরা প্রস্তুত। হজ মওসুমে যেতে পারিনি। কারণ আপনারা জানেন সৌদিতে ভিজিট ভিসা খুব কম হয়। ওমরাহ ভিসায় যেতে হয়। হজ শেষ হলো, ওমরাহ ভিসা চালু হলেই আমরা আবার যাব এবং এটা চালু করে দিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ। এটার মূল উদ্দেশ্য ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইদের সেবা দেয়া। প্রতিনিয়ত মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছেন। সংসারে সুখ আনতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটছেন দেশের বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠী। বিদেশে গেলেই কী টাকা রোজগার করা যায়? বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে দুর্বিষহ করুণ কাহিনীও তো আমরা দেখতে পাই। বিদেশমুখী এসব মানুষের উদ্দেশে সফল প্রবাসী ব্যবসায়ী দাতো এবাদত হোসেন বলেন, যারা বিদেশমুখী হচ্ছেন বেশিরভাগই ওয়ার্কার লেভেলের। ভাষা জানে না, অশিক্ষিত, অদক্ষ। শিক্ষিত লোক, টেকনিক্যাল কাজ জানা লোক কমই যাচ্ছে। যদি শিক্ষিত, ট্রেনিংপ্রাপ্ত, মেসিউরড বা ভাষা জানা লোক বিদেশে যায় তাহলেই তারা ভালো করবে। না হলে ভালো করা কঠিন। বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা যেমন জানতে হবে তেমনি দক্ষতা অর্জন করে টেকনিক্যাল কাজে যেতে হবে। তাহলে সফলতা আসবেই বলে মনে করি। এজন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। তার সফলতার পেছনে মরহুম বড় ভাইকে কৃতিত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমার বাবা-মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন বা বড় করেছেন ঠিকই কিন্তু আমার আজকের এই পর্যায়ে আসা বা সফলতার পেছনে বড় ভাইয়ের অবদান ৯৯ ভাগ। ২০১৮-২০২০ মেয়াদে বায়রা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন দাতো এবাদত হোসেন। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত সমঝোতার কমিটি হওয়ায় নির্বাচন আর হয়নি। এ প্রসঙ্গে দাতো এবাদত বলেন, বায়রার নির্বাচন নিয়ে যাই হয়েছে হোক, পূর্বের বদনাম দূর করে মালয়েশিয়ার মার্কেট যাতে ধরে রাখা যায় সরকার এবং বায়রার কমিটি এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছি। একইসাথে অভিবাসন ব্যয় যাতে কম থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, আমি মালয়েশিয়ায় দাতো হয়েছি। সে কারণে মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক সম্মান পাচ্ছি। মালয়েশিয়ায় কোনো বাংলাদেশি কর্মী যখন বিপদে পড়ে, পুলিশি ঝামেলায় পড়ে আমি তাদের পাশে দাঁড়াই, সেখানকার প্রশাসন আমার (দাতো) রেফারেন্সে ছেড়ে দিচ্ছে। একটা কারখানায় বেতন পাচ্ছে না, আমি জানার পর ফোন দিচ্ছি বা সরাসরি গিয়ে কথা বলার পর সমস্যার সমাধান হচ্ছে। এটুকু করতে পারছি বলেই আমি আত্মতৃপ্তি পাচ্ছি। দাতো এবাদত হোসেন বছরের বেশিরভাগ সময়ই মালয়েশিয়া ও ঢাকায় ব্যবসায়িক কাজে অবস্থান করেন। তবে স্ত্রী-সন্তানদের কিংবা ব্যবসায়িক কারণে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশেই তার পদচারণা।

পাঠকের মন্তব্য
লগইন করুন
লগইন মনে রাখুন